তোর রাত জাগা দুটি চোখে কাক ডাকা ভোর

সারা রাত। একেবারে সারাটা রাত-ই! তুই আমার চোখের ভাজ খুলে রাখলি। এলোমেলো ঝাকড়া চুলের ফাঁকে তোর আঙ্গুল চালিয়ে সারারাতজুড়ে খেলে গেলি। তোর মনের, মনের খুব গভীরের একটা দুইটা গোপন কথা আমার কাছে বলে দিলি। আমার কানের কাছে তখন তোর গরম নি:শ্বাস। আমার সারা শরীরে দাঁড়িয়ে পড়া ছোপ ছোপ লোম। আমি একটা বোকা বালিশ হয়ে তোর শরীরের নীচে আলুথালু পড়ে থাকলাম। তুই ইচ্ছা মতো নিংড়ে নিলি আমার জমানো জল…

তোর আর আমার মতের মিল হয় না কখনো। তোর আর আমার মাঝখানের ব্যবধানটা আকাশ-পাতালের চেয়ে বেশি। অনেক অনেক বেশি। পরিমাপ-ই করা যায় না! তবুও আমি আর তুই পরস্পরের ছোঁয়া ছাড়া বাঁচি না।

পরস্পরের নি:শ্বাসের ঘ্রাণ না পেলে আমাদের দম বন্ধ হয়ে আসে। কলিজা ফেটে যেতে চায়। কিন্তু আমাদের আসলে মিল হয়না তবু! কখনোই আমরা আমাদের নিজেদেরকে ধ্রুবতারা করে নিতে পারি না। পারিনা নিজেদের একেকটা সিদ্ধান্তে শ্রদ্ধা জানিয়ে গ্রহণ করতে। আমাদের মতের তাই মিল হয় না কখনো। অদ্ভুদ এক সম্পর্কের রহস্য-জালে আমরা জুড়ে থাকি। বন্দি থাকি। আটকে থাকি। আমাদের পায়ের নীচে মাটি থাকে, কিন্তু পথ থাকেনা। আমাদের দৃষ্টি অসীম হতে চেয়ে পারে না। আমাদের মন উড়ে উড়ে ঘুরে বেড়ায়, কিন্তু খুব কাছের পৃথিবীটা সে দেখতে পায় না। দেখতে পেলেও তাতে তার চরম অনীহা…

তবুও আমাদের দিন ভর করে আরো একটা নতুন দিনের পিঠে। তবুও আমাদের রাত ঘেমে ঘেমে পিচ্ছিল হয়ে সামনে এগিয়ে যায়। আমাদের আগামী বরাবরের মতো অনির্দিষ্ট থাকে। আমাদের পরিচিতজনরা, কাছেরজনরা আমাদের নিয়ে ভয়ে তটস্থ থাকে। কিন্তু আমাদের তাতে থোড়াই কেয়ার! আমাদের নিয়ে ভাবতেই আমাদের সময় হয়না, তাহলে কিভাবে অন্যদের ভাবার প্রশ্ন আসতে পারে? আমরা হেসে মরি! এতো গভীর অনিশ্চিত সময়েও আমরা হাসতে পারি। আমাদের ঠোটে রোদ চিকচিক করে। সে হাসিতে শান্তি হয়তো থাকেনা, কিন্তু সুখের ঢেকুরের অভাব হয় না। যদিও আমরা কোনোদিনই সুখ আর শান্তির ব্যবধানটা শিখিনি।

প্রত্যেকটা রাত বড় ভয়ে ভয়ে আমাদের ঘরে আসে। এসেই নিশ্চিতভাবে আমাদের গালাগালির আক্রোশের শিকার হয়। রাতের প্রথম ভাগটা প্রতিদিনই আমাদের বাক্য-ছুড়িতে ক্ষত বিক্ষত হয়। আমরা তাতে একটু আনন্দও পাইনা। কারণ, অন্তত রাতগুলোকে আমরা কখনোই কৃত্রিম করতে চাইনা। যদিও কৃত্রিমতার চোখপুড়া রঙে আমরা ভেসে চলি নিরন্তর। আমাদের ভেসে চলার স্রোত রাতের প্রথম ভাগগুলোকে প্রতিদিনই গিলে খায়। হারিয়ে যায় রাতের চেয়ে আরো বেশি গাঢ়তর আঁধারে। দ্বিতীয় ভাগে এসে আমরা ক্লান্ত-পরিশ্রান্ত। আমাদের জিভ অক্ষম হয়ে পড়ে। একটা কথাও তৈরি করতে পারেনা সে। কেবল ঠোট চারটি নিভু নিভু আলোর মতো কাঁপতে কাঁপতে প্রাণের প্রমাণ রেখে বেঁচে থাকে। বহুদিনের অগোছালো বিছানায় আমরা এলিয়ে দেই আমাদের হাড়গুড়…

আমারা পাশাপাশি পড়ে থাকি। রাত তখন খুব সতর্ক। আস্তে আস্তে গভীর হয়। রাতের চালাকি আমরা বুঝেও না বোঝার ভান করি। একটা সময় আমরা আর আমাদের দেখতে পারিনা। তাই বাধ্য হয়ে হাতের সীমায় হাত খুজি। পেয়েও যাই। তারপর… আমরা এক লাফে পেরিয়ে আসি হাজার ক্রোশ পথ। আমার হাতের ডানায় গুজে যায় তোর মাথা। আমাদের পাশাপাশি আলিঙ্গনে বোকা রাতটা ভয়ে থরথর!

তোর ঠোটের কামড়ে আমার ঠোট গলে যায়। ঝরে পড়ে হাজার ঝর্ণা-জল। সে জলে তুই পুরোপুরি জলপরী। সে জলে তুই ভাসিয়ে দেস তোরই সুখের জাহাজ। তোর কাছ থেকে সুখ কেনার দূর্দমনীয় কামনা জাগে আমার। সব দরজা ভেঙ্গে আমি তোর কাছে পৌছে যাই। আরে! তুই দেখি পরম ধন লাভের মতো করে টেনে নিলি আমায়! তবে কি সুখের দাম নিবিনা!

আঁধারে ভরা রাতের শরীরজুড়ে আলোর ঘ্রাণ। আলোর ঘ্রাণে মাতাল আমরা আঁধারের ধার ধারিনা। তোর জোয়ার-ভাটার আশ্চর্য সাগরে আমি তরী ভাসাই। ঘন আঁধারেই আমি ঠিক ঠিক খুজে পাই পথের দীশা। আমি পথ হারাই না। তোর শরীরের সব পথই যে আমার জানা। তোর বড় নখের আচড়ে আমার পিঠে দাগ পড়ে যায়। তোর তীব্র আলিঙ্গনে আমি সব ভোলা সাগর-যোদ্ধা। সাগরের বুকেই সপে দেই আমার অন্তরাত্মা। তুই তাতে প্রীত-অভিভূত।

০২
থরথর কাঁপা রাত আর ভয় তাড়াতে পারেনা। ভয়ে নি:শ্বেষ হয়ে যায়। টলে পড়ে তোর আর আমার দুই শরীরের ফাঁক ফোঁকরে। রাত হারিয়ে যায় আমাদের শরীরের ভাজে ভাজে। সে সুযোগে সূর্য জেগে উঠে প্রবল প্রতিপত্তি নিয়ে। আমাদের ভেন্টিলেটের কোয়াশা শুকিয়ে কাঠ হয়ে যায়। সে কাঠের শরীর নিয়ে আমাদের সুরসুরি দেয় রোদ।

খুলে রাখা চোখের ভাজ দিয়ে আলো পড়ে তোরই চোখে। সারারাতের জেগে থাকা চোখে এখন জংধরা ঘুম। ঘুমন্ত তোর হাত নিরাপদ থাকে আমার বুকের পাঁজরে। আমার চোখ তোর চোখ থেকে সরেনা। চোখের আদরে চোখ ঘুমিয়ে থাকে। চোখের পাপড়িতে ডানা মেলে ঘোর-পাখি। ঘোর উড়ে যায়। তোর চোখে ভীড় করে ভোরের কাক। সব জড়তা কাটিয়ে তুই খুলে দেস তোর চোখের ভাজ। ক্লান্ত হয়ে শুয়ে পড়া জিভ তোর হঠাত-ই শক্তির আধার। সাপের মতো ঢুকে আমাদের মুখ-গহ্বরে…

আবার তুই আর আমি রাতকে টেনে আনতে চাই ভোরে। ভোরের তাতে মন গলেনা। রোদের ছোয়ায় যে ভোর তখন পৌরুষ খুজে ফিরছে! যা হওয়ার তা-ই হতে যায়। কিন্তু হয়না! তার আগেই তোর সেলফোনের স্পিকারে ডাক উঠে। তোকে যেতে হবে। হাসপাতালের কেবিনজুড়ে রোগীদের মিছিল। তোর কাছে তাদের হাজার প্রয়োজন। তুই জামা খোলার মতো করে আমাকে ছাড়িয়ে যাস। বাথরুমের সাদা জলে ধুয়ে ফেলে দেস রাতের একেকটা ভাগ।

পেশাদারিত্বের মোড়কে ঢুকে পড়ি আমিও। দিনটাকে বিলীন করতে হবে নতুন সূতা-বোতাম আর কাপড়ের প্যাকেটে। পেটে কিছু গেলো কি না গেলো সে খবর তোর থাকেনা। আমারও ব্যস্ততা বিদেশি ক্রেতার নতুন দাবী মেটানোর উত্তর তৈরীতে। ভেজা চুল শোকানোর আগেই তোর এপ্রোন-মুখোশ পড়া শেষ হয়। আমার তখনও একটু বাকি থাকে। অফিসের সাজানো গোছানো টেবিলে বসার আগে আমি কোনোদিনই যে পুরোপুরি বিক্রেতা হয়ে উঠতে পারিনা।

দুপুরের হঠাত আলস্যে তোর মনে আমি আসি কিনা জানিনা। কিন্তু তুই ঠিকই চলে আসিস সামনে বসা টাইট জিন্স আর টপস পড়া বিদেশিনীর বাদামী চোখে। নতুন আরো একটা রাতের জন্ম হতে থাকে কোথাও। আমি আর তুই ততক্ষণে আবার হাজার বছরের দূরত্বে… আসলে আর ভালো লাগেনা।

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s